শজনে ও লাজনা—নাম যেমন কাছাকাছি, দেখতে গিয়েও অনেকেই বিভ্রান্ত হন। বাজারে বা গাছের ডাঁটা দেখে অনেকেই বুঝতে পারেন না, তিনি শজনে কিনছেন নাকি লাজনা। তবে উদ্ভিদবিদদের মতে, দেখতে প্রায় একই রকম হলেও গঠন, ফলন, চাষপদ্ধতি ও স্বাদের দিক থেকে এ দুই উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য।
উদ্ভিদবিদ ও গবেষক জিনিয়া নাসরিন জানান, শজনেকে যেমন বিভিন্ন এলাকায় শজিনা বা মরিঙ্গা নামে ডাকা হয়, তেমনি লাজনাও অঞ্চলভেদে রাইখঞ্জন বা বহুপল্লভা নামে পরিচিত। তবে নাম ও বাহ্যিক মিল থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এদের বৈশিষ্ট্যে ভিন্নতা রয়েছে।
দেশি শজনেগাছ সাধারণত সোজা ও লম্বা হয়ে থাকে এবং এর উচ্চতা ১০ থেকে ১২ মিটার বা তারও বেশি হতে পারে। গাছের ডালপালাও ওপরের দিকে বিস্তৃত হয় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি শক্ত কাষ্ঠল গাছে পরিণত হয়। অন্যদিকে লাজনা গাছ তুলনামূলকভাবে ছোট, ঝোপালো বা বামন প্রকৃতির হয়। এর উচ্চতা সাধারণত ৪ থেকে ৬ মিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, ফলে পরিচর্যা ও ফল সংগ্রহ তুলনামূলক সহজ।
কাণ্ড ও ডালপালার ক্ষেত্রেও পার্থক্য লক্ষ করা যায়। শজনের কাণ্ড শক্ত ও কিছুটা মসৃণ ছালযুক্ত, আর ডাল কেটে মাটিতে পুঁতলেই নতুন গাছ জন্মে। তাই সাধারণত ডাল রোপণের মাধ্যমেই শজনের চাষ করা হয়। বিপরীতে লাজনার কাণ্ড কিছুটা নরম ও মোটা হয় এবং দ্রুত বাড়লেও শজনের মতো ততটা শক্ত হয় না। লাজনা ডাল থেকেও জন্মাতে পারে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বীজের মাধ্যমেই এর চাষ করা হয়।
ফুল ও ফলনের ক্ষেত্রেও রয়েছে ভিন্নতা। শজনে মৌসুমি গাছ, বছরে একবার ফুল আসে এবং একবারই ফল দেয়, সাধারণত বসন্তের শেষ দিকে। ফুলের রং সাদাটে বা অফ-হোয়াইট এবং ফুল ফোটার সময় গাছের পাতা প্রায় ঝরে যায়। অন্যদিকে লাজনা বারোমাসি জাত হিসেবে পরিচিত, বছরে অন্তত দুইবার, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সারা বছরই ফুল ও ফল দিতে পারে। এর ফুল তুলনামূলক ছোট, গাঢ় ঘিয়ে রঙের এবং পাপড়িতে লালচে দাগ দেখা যায়, যা শজনের ফুলে থাকে না। এছাড়া লাজনাগাছে ফুল এলেও পাতা ঝরে না বললেই চলে।
ফলনের দিক থেকেও লাজনা এগিয়ে। সাধারণত রোপণের ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যেই এতে ফলন শুরু হয়, যেখানে শজনে গাছে ফল ধরতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে।
ডাঁটার গঠন ও স্বাদেও রয়েছে পার্থক্য। শজনের ডাঁটা লম্বা, চিকন ও তুলনামূলক বেশি আঁশযুক্ত এবং স্বাদে সুস্বাদু। ডাঁটা সাধারণত সোজা এবং সবুজ সতেজ থাকে। অন্যদিকে লাজনার ডাঁটা অপেক্ষাকৃত ছোট, মোটা ও কিছুটা বাঁকা প্রকৃতির হয়। রং ধূসর-সবুজ এবং ভেতরে নরম হলেও বাইরের অংশ শক্ত। অনেকের মতে, শজনের তুলনায় লাজনা কিছুটা কম সুস্বাদু এবং কখনো কখনো সামান্য তেতো ভাবও পাওয়া যায়।
তবে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দুটি উদ্ভিদেরই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুণ ও ঔষধি গুণ। বিশেষ করে বসন্তকালে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে শজনে ও লাজনা সমানভাবে উপকারী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে খাবার ও স্বাস্থ্য—দুই দিক থেকেই এই দুই উদ্ভিদের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।


